করোনাভাইরাস কি, রোগের লক্ষণ, চিকিৎসা ও সুরক্ষা এক নজরে দেখে নিন!!

0
122

করোনাভাইরাস কি ?
করোনাভাইরাস অনেকগুলো ভাইরাসের একটি বড় পরিবার যা জীব জন্তু বা মানুষের অসুখের কারণ হতে পারে। বেশ কয়েকটি করোনাভাইরাস মিলে মানুষের মধ্যে সাধারণ ঠাণ্ডা লাগা থেকে শুরু করে মিডিল ইষ্ট রেসপিরেটরি সিন্ড্রোম (এমইআরএস) এবং সিভিয়ার একিউট রেস্পিরেটরি সিন্ড্রোম (এসএআরএস) এর মতো মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করতে পারে বলে জানা যায়।

কোভিড -১৯ কি ?
কোভিড -১৯ হল নতুন খুঁজে পাওয়া করোনাভাইরাস থেকে ছড়ানো একটি সংক্রামক রোগ। এই নতুন ভাইরাস এবং রোগটি ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে মহামারি হওয়ার আগে বিশ্বের কাছে অজানা ছিল।

কোভিড -১৯ এর সাধারণ লক্ষণগুলি হলোঃ
জ্বর, ক্লান্তি, শুকনো কাশি ইত্যাদি। অনেকের আবার ব্যথা বেদনা, নাক বন্ধ, নাক দিয়ে পানি পরা, গলা ব্যথা বা ডায়রিয়া হতে পারে। এই লক্ষণগুলি শুরুতে কম থাকে এবং ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। আক্রান্ত অনেকের মধ্যে মধ্যে এই রোগ এর কোনও লক্ষণ দেখা যায়না এবং তাঁরা অসুস্থও বোধ করেন না। বেশিরভাগ লোক (প্রায় ৮০%) বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন ছাড়াই সুস্থ হয়ে উঠেন। কোভিড -১৯ হওয়া প্রত্যেক ৬ জনের মধ্যে ১ জন ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাঁদের শ্বাস নিতে অসুবিধা হয়। বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাঁদের উচ্চ রক্ত চাপ, হার্টের সমস্যা বা ডায়াবেটিসের মতো অসুস্থতা রয়েছে , তাঁদের জন্য ঝুঁকিটা বেশি এবং তাঁদের ভীষণভাবে অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে । তাই এসব মানুষের দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া উচিত। সরকারি হেল্পলাইন ৩৩৩, ১৬২৬৩, ১০৬৫৫ নম্বরে ফোন করে চিকিৎসা ও পরামর্শ নেয়া যাবে।

কোভিড -১৯ কীভাবে ছড়ায়?
সাধারণত যেভাবে ছড়ায়ঃ
১। কোভিড -১৯ এ আক্রান্ত রোগী থেকে এই রোগ অন্য মানুষে ছড়ায়;
২। কোভিড -১৯ এ আক্রান্ত মানুষের নাক ও মুখ থেকে বেরিয়ে আসা হাঁচি কাশির মাধ্যমে ছড়িয়ে পরা ড্রপলেট (কাশি বা নিঃশ্বাস থেকে যে পানির ফোঁটা তৈরি হয়) এর দ্বারা এই রোগ ছড়ায়;
৩। এই ড্রপলেট/পানির ফোঁটাগুলি মানুষের চারপাশের জিনিস ও জায়গার উপর লেগে থাকে;
৪। কেউ যদি এই জিনিস বা জায়গাগুলি স্পর্শ করে এবং তারপরে নিজের চোখ, নাক বা মুখে হাত দেয় তবে এই রোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বেড়ে যাবে; কোভিড -১৯ আক্রান্ত লোকের হাঁচি কাশি বা নিঃশ্বাস থেকে বের হওয়া ড্রপলেট/পানির ফোঁটা যদি অন্য কারো শরীরে ঢোকে, তাহলে কোভিড -১৯ ছড়াতে পারে। সেইজন্য অসুস্থ লোকের থেকে ৩ ফুট (১ মিটারের) বেশি দূরে থাকা অত্যন্ত জরুরি।

কোভিড -১৯ এর ভাইরাসটি কি বাতাসের মাধ্যমে ছড়াতে পারে?
এ পর্যন্ত হওয়া গবেষণা থেকে জানা যায় কোভিড -১৯ এর ভাইরাসটি বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় না। আক্রান্ত লোকের হাঁচি কাশি বা নিঃশ্বাস থেকে বের হওয়া ড্রপলেট/পানির ফোঁটা যদি নিঃশ্বাসের মাধ্যমে অন্য কারো শরীরে ঢোকে তাহলে কোভিড -১৯ ছড়াতে পারে। কোভিড -১৯ এমন কোনও ব্যক্তির থেকে ছড়াতে পারে যার কোনো লক্ষণ নেই? কোভিড -১৯ এ আক্রান্ত অনেক লোক অসুস্থ বোধ করে না। রোগ এর প্রথম দিকে এমন হতে পারে l তাই, যার কেবল অল্প কাশি আছে এবং খুব অসুস্থ বোধ করছেন না, এমন কারোর কাছ থেকেও কোভিড -১৯ এ আক্রান্ত হওয়া সম্ভব l

ভাইরাসটি বিভিন্ন জিনিস বা জায়গার ওপরে কতক্ষন থাকতে পারে?
করোনাভাইরাসের বিভিন্ন জিনিসের ওপরে থাকার ব্যপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে যে সাধারন জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করলে, এগুলোকে খুব সহজেই নষ্ট করা যায়। গবেষণায় জানা গেছে যে এই ভাইরাস স্টিল অথবা প্লাস্টিকের ওপর ৭২ ঘন্টা পর্যন্ত, পেতলের ওপর ৪ ঘন্টা পর্যন্ত এবং কার্ড বোর্ডের ওপর, ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। মনে করে, বারে বারে অ্যালকোহল যুক্ত হ্যান্ড-স্যানিটাইজার দিয়ে অথবা সাবান পানি দিয়ে অবশ্যই হাত ধোবেনl নিজের চোখ, মুখ এবং নাকে হাত দেবেন না।

আমি, আমার আপনজন এবং প্রতিবেশীদের সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচাতে চাইলে আমার কি করা উচিত?
অ্যালকোহল যুক্ত হ্যান্ড রাব দিয়ে হাত ঘষা বা সাবান এবং পানি দিয়ে আপনার হাত নিয়মিত এবং পুরোপুরি ভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করুন। কারণ সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধুলে বা অ্যালকোহল যুক্ত হ্যান্ড রাব দিয়ে হাত ঘষলে আপনার হাতে থাকা যেকোনো ভাইরাস মরে যায়। অন্য মানুষের থেকে ৩ ফুট (১ মিটার) দূরে থাকুন হাঁচি বা কাশি আছে এমন যেকোন ব্যাক্তির থেকে কমপক্ষে ৩ ফুট (১ মিটার) দূরত্ব বজায় রাখুন। কারণ যখন কেউ কাশে বা হাঁচি দেয় তখন তাদের নাক বা মুখ থেকে ক্ষুদ্র পানির কণা বেরোয় যার মধ্যে করোনা ভাইরাস থাকতে পারে। আপনি যদি এই হাঁচি / কাশি হওয়া ব্যাক্তির খুব কাছাকাছি থাকেন এবং যদি তাঁর মধ্যে করোনা ভাইরাস থেকে থাকে, তাহলে আপনার নিঃশ্বাস এর মাধ্যমে ওই ক্ষুদ্র পানির কণা করোনাভাইরাস সহ আপনার শরীরে প্রবেশ করবে। পারতপক্ষে চোখ, নাক এবং মুখ স্পর্শ করবেন না। কারণআমাদের হাত নানারকম জায়গা স্পর্শ করে যেখানে ভাইরাস থাকতে পারে। এই দূষিত হাত আপনার চোখ, নাক বা মুখে ভাইরাস পৌঁছে দিতে পারে। সেখান থেকে ভাইরাসটি আপনার দেহে প্রবেশ করতে পারে এবং আপনাকে অসুস্থ করতে পারে। – আপনার চারপাশের লোকেরা সঠিক ভাবে হাঁচি কাশি সম্পর্কিত শিষ্টাচার মেনে চলছে কিনা তা সুনিশ্চিত করুন। এর অর্থ আপনার কাশি বা হাঁচি পেলে কনুই দিয়ে বা টিস্যু দিয়ে নিজের মুখ এবং নাক ঢেকে নিন। তারপরে অবিলম্বে ব্যবহৃত টিস্যুগুলি একটি ঢাকনা যুক্ত ময়লা ফেলার বিনে ফেলে দিন। কারণ নাক-মুখ থেকে বেরিয়ে আসা ক্ষুদ্র পানির বিন্দু ভাইরাস ছড়ায়। সঠিক ভাবে হাঁচি কাশি সম্পর্কিত শিষ্টাচার পালন করে আপনি আপনার চারপাশের লোকজনকে ঠান্ডা, সর্দিজ্বর এবং কোভিড -১৯ এর ভাইরাস থেকে রক্ষা করতে পারবেন। – অসুস্থ বোধ করলে বাড়িতে থাকুন। যদি আপনার জ্বর, কাশি এবং শ্বাস নিতে সমস্যা হয় তবে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং আগাম কল করুন। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশাবলী অনুসরণ করুন l কারণ জাতীয় ও স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কাছে আপনার অঞ্চলের পরিস্থিতি সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য থাকবে। আগে থেকে কল করলে আপনার স্বাস্থ্যকর্মী আপনাকে দ্রুত পরামর্শ দেবে এবং চিকিৎসার জন্য সঠিক হাসপাতালে যাওয়ার নির্দেশ দেবে। এর ফলে আপনি নিরাপদ থাকবেন এবং অন্য ভাইরাস ও জীবাণুর সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকবেন l – কোভিড -১৯ এর সব নতুন হটস্পটগুলি (শহর বা স্থানীয় অঞ্চল যেখানে কোভিড -১৯ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে) সম্বন্ধে সচেতন থাকুন। এই জায়গায় গুলিতে কোনো কাজের জন্য যাবেন না – বিশেষত আপনি যদি বয়স্ক ব্যক্তি হন বা আপনার ডায়াবেটিস, হার্ট বা ফুসফুসের রোগ থাকে। কারণ এই জায়গাগুলি তে আপনার কোভিড -১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

মাস্ক লাগানো, খোলা, ফেলে দেওয়ার ও ব্যবহার করার সঠিক পদ্ধতি কি?
১. মনে রাখবেন, মেডিকেল মাস্ক কেবলমাত্র স্বাস্থ্যকর্মী, যিনি রোগীর যত্ন নিচ্ছেন এবং জ্বর, কাশি এবং শ্বাসকষ্টের লক্ষণ যাঁদের আছে, তাঁদেরই ব্যবহার করা উচিত।
২. মাস্ক লাগানোর আগে অ্যালকোহল-দেওয়া হ্যান্ডরাব বা সাবান এবং পানি দিয়ে হাত পরিষ্কার করুন।
৩. মাস্কটি ভালভাবে দেখে নিন যাতে ছেঁড়া বা ফাটা না থাকে।
৪. মাস্কের উপরের দিকটি ঠিক করে দেখে নিন ( যেখানে ধাতুর স্ট্রিপটি রয়েছে)l
৫. পরার সময় মাস্কের রঙিন দিকটি বাইরের দিকে থাকবে।
৬. মাস্কটি আপনার মুখের ওপর রাখুন। ধাতুর স্ট্রিপটি বা মাস্কের শক্ত দিক আঙ্গুল দিয়ে নাকের ওপর চেপে লাগান যাতে মাস্কটি ভালভাবে নাকের আকার ধারন করে।
৭. মাস্কটি নীচের দিকে টানুন যাতে এটি আপনার মুখ এবং থুতনি ঢেকে রাখে।
৮. ব্যবহারের পরে, মাস্কটি খুলে ফেলুন – কানের পিছন থেকে ইলাস্টিক লুপগুলি সাবধানে খুলে ফেলুন, যাতে সামনের সম্ভাব্য দূষিত দিকগুলি না ছোঁয়া হয় এবং নিজের মুখ এবং জামাকাপড় থেকে দূরে রাখা হয় l
৯. ব্যবহারের পরে অবিলম্বে একটি বন্ধ বিনে মাস্কটি ফেলে দিন। ১০. মাস্ক ছোঁয়া বা খোলার পর হাত ভাল ভাবে পরিষ্কার করুন সাবান ও পানি দিয়ে নিজের হাত ধোবেন বা তা না হলে, অ্যালকোহল দেওয়া হ্যান্ডরাব ব্যবহার করবেন l

কিভাবে মানসিক চাপ সহ্য করতে পারি?
বর্তমান পরিস্থিতিতে দুঃখ অনুভব করা, মানসিক চাপ, ভয় পাওয়া, মানসিক ভাবে ক্লান্ত বোধ করা , বিভ্রান্ত, বা রাগ হওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার । এক্ষেত্রে করনীয়ঃ
১। আপনজনের সাথে কথা বলা আপনার জন্য ভালো হবে । আপনার বন্ধুদের সাথে, কাছের মানুষ ও আত্মীয় স্বজনের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন।
২। আপনাকে বাড়িতেই থাকতে হবে, তাই স্বাস্থ্যকর জীবনধারা মেনে চলুন, পুষ্টিকর খাবার খান, পর্যাপ্ত ঘুমান এবং ব্যায়াম করুন। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন আপনাকে দুশ্চিন্তা মুক্ত রাখবে।
৩। দুশ্চিন্তা দূর করার জন্য ধূমপান, মদ্যপান বা কোনো ড্রাগ ব্যবহার করবেন না। আপনি যদি খুব বেশি মানসিক চাপ বোধ করেন, তাহলে কোনও স্বাস্থ্যকর্মী বা কাউন্সেলর এর সাথে কথা বলুন। ভাল করে পরিকল্পনা করুন, যে দরকার হলে আপনি নিজের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য কোথায় যাবেন এবং কিভাবে সাহায্য চাইবেন l সঠিক সূত্র (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, এর ওয়েবপেজ, স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ) থেকে খবর যোগাড় করুন।
৪। মিডিয়া তে প্রচার করা যে সমস্ত খবরাখবর আপনাকে চিন্তিত বা ব্যথিত করে তোলে, আপনি ও আপনার পরিবার সেই গুলি দেখবেন না।
৫। ইতোপূর্বে আপনার জীবনের কঠিন সময়ে আপনি যে সমস্ত গুণ দিয়ে কঠিন সময়ের মোকাবিলা করেছেন, সেই গুণগুলির কথা মনে করুন। এই মহামারির কঠিন সময়ে, নিজের অনুভূতি কে সঠিক পথে চালিত করতে সেই দক্ষতাগুলি ব্যবহার করুন।

সূত্রঃ https://corona.gov.bd/

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here